IAS Success Story: মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করে ৪ বারে UPSC জয়, জানুন আইএএস অংশুমান রাজের অনুপ্রেরণামূলক কাহিনী

Upsc success story in bengali

ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষা ভারতের সবচেয়ে কঠিন এবং মর্যাদাপূর্ণ পরীক্ষাগুলির মধ্যে একটি। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী আইএএস (IAS), আইপিএস (IPS) বা আইএফএস (IFS) অফিসার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এই পরীক্ষায় বসেন। কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য পান মুষ্টিমেয় কয়েকজন। অনেকেই মনে করেন, এই পরীক্ষায় সফল হতে গেলে প্রয়োজন নামিদামি কোচিং সেন্টার, প্রচুর অর্থ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু এই সব ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে এক অবিশ্বাস্য সাফল্যের ইতিহাস রচনা করেছেন বিহারের অংশুমান রাজ (Anshuman Raj)। কোনও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই, চরম দারিদ্র্য এবং অভাবকে জয় করে তিনি আজ একজন সফল আইএএস অফিসার। অংশুমানের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, ইচ্ছা, অধ্যাবসায় এবং লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, তবে পৃথিবীর কোনও বাধাই কাউকে আটকাতে পারে না। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা অংশুমান রাজের এই অদম্য লড়াই এবং অনুপ্রেরণামূলক সাফল্যের গল্প বিস্তারিতভাবে জানব, যা সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া প্রতিটি প্রার্থীর জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়।

শৈশব এবং পরিবারের চরম আর্থিক সংকট


অংশুমান রাজের জন্ম বিহারের বক্সার জেলার নওয়ানগর ব্লকের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের আর পাঁচটা ছেলের মতোই তাঁর শৈশব কেটেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শুরুটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। একসময় তাঁর বাবার একটি রাইস মিলের ব্যবসা ছিল। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সেই ব্যবসায় এক চরম বিপর্যয় নেমে আসে। রাইস মিল ব্যবসায় বিরাট আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় তাঁর পরিবার। এই ঘটনাটি তাঁদের পুরো পরিবারকে এক গভীর আর্থিক সংকটের মধ্যে ঠেলে দেয়। বিলাসবহুল জীবন তো দূরের কথা, দৈনন্দিন জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোই এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সেই চরম দুর্দিনে পরিবারের হাল শক্ত হাতে ধরেন তাঁর মা। তিনি পেশায় ছিলেন একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। তাঁর সামান্য আয়েই কোনওরকমে সংসারের চাকা ঘুরতে থাকে। মায়ের এই অদম্য লড়াই এবং আত্মত্যাগ ছোটবেলা থেকেই অংশুমানের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই অভাবের অন্ধকার থেকে পরিবারকে টেনে তুলতে হলে শিক্ষার কোনও বিকল্প নেই।

বিদ্যুৎহীন রাতে মোমবাতি ও কেরোসিনের আলোয় পড়াশোনা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে যখন ল্যাপটপ, ইন্টারনেট এবং ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পরিষেবা ছাড়া পড়াশোনার কথা ভাবাই যায় না, তখন অংশুমানের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও তা ছিল অত্যন্ত অনিয়মিত। দিনের বেশিরভাগ সময়, বিশেষ করে রাতে, বিদ্যুৎ থাকত না। কিন্তু এই প্রতিকূলতা অংশুমানের পড়াশোনার পথে বাধা হতে পারেনি। রাতের অন্ধকারে যখন চারপাশ ডুবে যেত, তখন তাঁর একমাত্র সঙ্গী ছিল কেরোসিনের ল্যাম্প বা একটি ছোট্ট মোমবাতি।
মোমবাতির সেই টিমটিমে আলোতেই তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকতেন। চোখের উপর চাপ পড়ত, ক্লান্তি আসত, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল স্থির। তিনি জানতেন, এই অন্ধকারের পরেই লুকিয়ে আছে এক নতুন ভোরের আলো। আর্থিক অনটন এবং বিদ্যুতের অভাবকে তিনি নিজের দুর্বলতা না বানিয়ে, নিজের জেদ এবং পরিশ্রমের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। তাঁর এই লড়াই আমাদের শেখায় যে, সফল হওয়ার জন্য শুধু বাহ্যিক সুবিধার প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় অন্তরের অদম্য ইচ্ছাশক্তির।

শিক্ষাজীবন এবং লক্ষ্য স্থির রাখা

অনেকেরই ধারণা আছে যে, ইউপিএসসি-র মতো পরীক্ষায় সফল হতে গেলে দেশের সেরা এবং ব্যয়বহুল প্রাইভেট স্কুল থেকে পড়াশোনা করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অংশুমান এই ধারণাকেও সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছেন। তিনি তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশোনা সম্পন্ন করেন বক্সারের জওহর নবোদয় বিদ্যালয় থেকে। এরপর দ্বাদশ শ্রেণীর পড়াশোনার জন্য তিনি রাঁচির নবোদয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সম্পূর্ণ সরকারি কাঠামোর মধ্যে থেকেই তিনি তাঁর শিক্ষার ভিত মজবুত করেছিলেন।
নবোদয় বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন এবং শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা তাঁকে ভবিষ্যৎ জীবনের কঠিন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেছিল। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মেধা এবং অধ্যবসায় থাকলে সাধারণ একটি সরকারি স্কুল থেকে পড়াশোনা করেও দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। তাঁর এই শিক্ষাজীবন প্রমাণ করে যে, আসল বিষয় হলো শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীর নিজের শেখার আগ্রহ।
দামি কোচিং ছাড়াই ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষার প্রস্তুতি
ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দিল্লিতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে নামিদামি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়াটা যেন একটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অংশুমানের পরিবারের সেই সামর্থ্য ছিল না। তিনি জানতেন, তাঁকে যা করতে হবে, নিজের চেষ্টাতেই করতে হবে। তাই তিনি সেলফ-স্টাডি বা স্ব-অধ্যয়নের উপর সম্পূর্ণ জোর দেন।


ইন্টারনেটের সীমিত ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় বইপত্র জোগাড় করে তিনি নিজেই নিজের রুটিন তৈরি করেন। সিলেবাস সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারণা নেওয়া, বিগত বছরের প্রশ্নপত্র সমাধান করা এবং নিয়মিত মক টেস্ট দেওয়া—এই পদ্ধতিগুলিকেই তিনি তাঁর প্রস্তুতির মূল মন্ত্র বানিয়েছিলেন। তাঁর এই পদ্ধতি সেই সকল ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা, যারা অর্থাভাবের কারণে কোচিং নিতে পারেন না। অংশুমান বুঝিয়ে দিয়েছেন, সঠিক রণনীতি এবং নিরলস পরিশ্রম থাকলে সেলফ-স্টাডি করেও ইউপিএসসি ক্র্যাক করা যায়।

চারবারের চেষ্টায় ইউপিএসসি (UPSC) ক্র্যাক: ব্যর্থতাকে হাতিয়ার করে জয়

সাফল্যের রাস্তা কখনোই একবারে মসৃণ হয় না। অংশুমানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাঁর আইএএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন একবারে পূরণ হয়নি। তিনি একবার নয়, দুবার নয়, পরপর তিনবার ইউপিএসসি পরীক্ষায় ব্যর্থ হন। প্রতিবারই চূড়ান্ত লক্ষ্যের কাছাকাছি গিয়েও তাঁকে নিরাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়। একজন সাধারণ প্রার্থীর জন্য পরপর তিনবার এমন কঠিন পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া চরম হতাশার কারণ হতে পারে। অনেকেই এই পর্যায়ে এসে হাল ছেড়ে দেন এবং অন্য পেশা বেছে নেন।
কিন্তু অংশুমান অন্য ধাতুতে গড়া ছিলেন। প্রতিটি ব্যর্থতাকে তিনি তাঁর সাফল্যের এক একটি ধাপ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হতাশ হয়ে পড়েননি, বরং প্রতিবার ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি বিশ্লেষণ করেছেন কোথায় তাঁর ভুল হচ্ছে। নিজের দুর্বলতাগুলিকে চিহ্নিত করে সেগুলিকে শোধরানোর জন্য তিনি দ্বিগুণ পরিশ্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অবশেষে তাঁর এই ধৈর্য এবং অধ্যাবসায়ের ফল মেলে ২০১৯ সালে। নিজের চতুর্থ প্রচেষ্টায় তিনি ইউপিএসসি পরীক্ষায় শুধু পাশই করেননি, বরং সর্বভারতীয় স্তরে ১০৭ তম র‍্যাঙ্ক অর্জন করে আইএএস (IAS) অফিসার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। তাঁর এই জয় ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের আত্মত্যাগ এবং লড়াইয়ের চূড়ান্ত পুরস্কার।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা


আইএএস অংশুমান রাজের এই কাহিনী শুধু একটি সাফল্যের গল্প নয়, এটি লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। বর্তমান প্রজন্ম যখন ছোটখাটো অভাব বা প্রতিকূলতায় সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে, তখন অংশুমানের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, লড়াই করার মানসিকতা থাকলে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। দামি ল্যাপটপ, এসি রুম, হাই-স্পিড ইন্টারনেট বা উচ্চবিত্ত পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড—এগুলির কোনওটিই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি নয়। সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি হলো কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকা। দারিদ্র্য যে প্রতিভার পথে বাধা হতে পারে না, তা তিনি অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করেছেন।

আরো পড়ুনসাংবাদিকতা করতে চান ? জানুন সাংবাদিক হতে গেলে কি যোগ্যতা প্রয়োজন, কিভাবে সাংবাদিক হওয়া যায় ?

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, আইএএস অংশুমান রাজের জীবন এক অবিরাম সংগ্রামের ইতিহাস। বক্সারের এক প্রত্যন্ত গ্রামের অন্ধকার ঘর থেকে শুরু করে দেশের অন্যতম সম্মানজনক পদ আইএএস অফিসার হওয়ার এই সফর সত্যিই রূপকথার মতো। তবে এই রূপকথা কোনও জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় তৈরি হয়নি, তৈরি হয়েছে ঘাম, রক্ত এবং অসীম ধৈর্যের বিনিময়ে। তাঁর এই কাহিনী আগামী দিনেও হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী এবং স্বপ্নদর্শীদের পথ দেখাবে। ব্যর্থতা যে জীবনের শেষ নয়, বরং নতুন করে শুরু করার একটা সুযোগ, অংশুমান রাজ তাঁর জীবন দিয়ে সেই বার্তাই আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

________________________________________
About the Author
Bikram Dutta

Bikram Dutta

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক। গত ৩ বছর ধরে শিক্ষা, চাকরি এবং সরকারি প্রকল্প নিয়ে নিয়মিত তথ্যসমৃদ্ধ লেখালেখি করছেন। সহজ ও সাবলীল ভাষায় পাঠকদের কাছে সঠিক গাইডেন্স পৌঁছে দেওয়াই তাঁর মূল লক্ষ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন