ভারতের অটোমোবাইল ইতিহাসের অন্যতম সফল এবং স্মরণীয় বাণিজ্যিক জোট ছিল ‘হিরো হোন্ডা’ (Hero Honda)। একসময় ভারতীয় মধ্যবিত্তের কাছে বাইক মানেই ছিল হিরো হোন্ডার স্প্লেন্ডার বা প্যাশন। “Fill it, Shut it, Forget it”— এই স্লোগান শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জ্বালানি সাশ্রয়ী এক নির্ভরযোগ্য মোটরসাইকেলের ছবি। ১৯৮৪ সালে শুরু হওয়া এই যৌথ উদ্যোগ ভারতীয় দুই চাকার বাজারকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল এবং ২০১০ সাল নাগাদ এটি পরিণত হয়েছিল বিশ্বের বৃহত্তম টু-হুইলার প্রস্তুতকারক সংস্থায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যবসার শীর্ষে থাকা অবস্থাতেই কেন ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে হিরো এবং হোন্ডা তাদের দীর্ঘ ২৬ বছরের অংশীদারিত্ব ভেঙে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল? বাহ্যিকভাবে সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে কাজ করেছিল গভীর ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির অমিল এবং বিশ্বায়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
হিরো ও হোন্ডার যৌথ যাত্রার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
১৯৮০-র দশকের শুরুতে ভারতীয় টু-হুইলার বাজারে রাজত্ব করছিল টু-স্ট্রোক স্কুটার। সেই সময় ভারতীয় সাইকেল নির্মাতা মুঞ্জাল পরিবারের ‘হিরো গ্রুপ’ এবং জাপানের বিশ্ববিখ্যাত ‘হোন্ডা মোটর কোম্পানি’ এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করে।
এই চুক্তির সমীকরণ ছিল অত্যন্ত নিখুঁত:
* হোন্ডা: সরবরাহ করত বিশ্বমানের ফোর-স্ট্রোক ইঞ্জিন এবং অত্যাধুনিক জাপানি প্রযুক্তি।
* হিরো গ্রুপ: সামলাত ভারতের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত বিপণন নেটওয়ার্ক, খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনা এবং ভারতীয় গ্রাহকদের মনস্তত্ত্ব বোঝার দক্ষতা।
১৯৮৫ সালে তাদের প্রথম বাইক ‘CD 100’ বাজারে আসতেই বাজিমাত করে। পরবর্তীকালে ‘স্প্লেন্ডার’ ও ‘প্যাশন’-এর মতো জনপ্রিয় মডেলের ওপর ভর করে তারা ভারতীয় বাজারে অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠে। তবে সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে দুই সংস্থার ব্যবসায়িক লক্ষ্যের মধ্যে ফারাক স্পষ্ট হতে শুরু করে।
হিরো হোন্ডা বিচ্ছেদের প্রধান কারণসমূহ
২৬ বছরের একটি অত্যন্ত লাভজনক যৌথ উদ্যোগ হঠাৎ শেষ হয়ে যায়নি। বেশ কিছু গুরুতর কাঠামোগত সমস্যা এবং দ্বন্দ্বের কারণে এই বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল:
১. বিশ্বব্যাপী পণ্য রপ্তানি নিয়ে দ্বন্দ্ব (Conflict over Global Exports)
যৌথ উদ্যোগের মূল চুক্তি অনুযায়ী, হিরো হোন্ডার লক্ষ্য ছিল কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণ করা। পরবর্তীকালে চুক্তি সামান্য সংশোধন করে নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং কলম্বিয়ার মতো সীমিত কিছু দেশে রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়।
২০০৮ সাল নাগাদ হিরো হোন্ডা বিশ্বের বৃহত্তম টু-হুইলার নির্মাতা হয়ে উঠলে তারা আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে ব্যাপক হারে বাইক রপ্তানি করতে চায়। কিন্তু এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় হোন্ডা। কারণ ওইসব দেশে হোন্ডার নিজস্ব সহযোগী সংস্থা আগে থেকেই ব্যবসা করছিল। হোন্ডা কোনোভাবেই চায়নি তাদেরই যৌথ উদ্যোগের বাইক আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের নিজস্ব পণ্যের সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামুক। ফলে হিরোর বৈশ্বিক সম্প্রসারণ আটকে যায়।
২. প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা ও গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D Independence)
একটি আধুনিক অটোমোবাইল ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার জন্য নিজস্ব ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (R&D) থাকা জরুরি। যৌথ উদ্যোগে প্রযুক্তি সম্পূর্ণভাবে জাপানি হেডকোয়ার্টারের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
হিরো চেয়েছিল নিজস্ব উদ্যোগে গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলে স্বাধীনভাবে নতুন মডেলের ইঞ্জিন ও ডিজাইন তৈরি করতে। কিন্তু হোন্ডা প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি ছিল না। এর পাশাপাশি, হোন্ডার প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য হিরোকে প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের ‘রয়্যালটি’ দিতে হতো। হিরো ম্যানেজমেন্ট বুঝতে পেরেছিল, চিরকাল শুধু একটি প্রযুক্তি গ্রাহক হয়ে থাকলে ব্র্যান্ডের ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
৩. অভ্যন্তরীণ বাজারে সরাসরি প্রতিযোগিতা ও HMSI-এর উত্থান
বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল ভারতীয় বাজারে হোন্ডার নিজস্ব পদক্ষেপ। ১৯৯৯ সালে হোন্ডা ভারতে তাদের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান গঠন করে— Honda Motorcycle & Scooter India (HMSIPL)।
সেই সময় তৎকালীন সরকারি নিয়ম (Press Note 1) অনুসারে হিরো হোন্ডার থেকে ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (NOC) নিতে হয়। হিরো এই শর্তে অনুমতি দেয় যে হোন্ডা সরাসরি তাদের বর্তমান পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতা করবে না। হোন্ডা শুরুতে শুধু স্কুটার (যেমন অ্যাক্টিভা) তৈরি করত। কিন্তু ২০১০ সালে হোন্ডা ঘোষণা করে যে তারা ভারতের বাজারে সরাসরি ১১০ সিসি কমিউটার বাইক নামাবে।
উল্লেখ্য, এই ১১০ সিসি সেগমেন্ট থেকেই আসত হিরো হোন্ডার মোট বিক্রির প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি। অংশীদার সংস্থা যখন নিজেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে বাজারে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন অংশীদারিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৪. পরিচালন পর্ষদ ও তথ্য ব্যবহারের অমিল
পরিচালন পর্ষদে (Board of Directors) হোন্ডার প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকার কারণে হিরো হোন্ডার অভ্যন্তরীণ সমস্ত ব্যবসায়িক কৌশল, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বিপণন কৌশল খুব সহজেই হোন্ডা ম্যানেজমেন্টের কাছে চলে যেত। অন্যদিকে, হোন্ডার নিজস্ব সংস্থা (HMSI) ভারতে কী কৌশল গ্রহণ করছে, সে বিষয়ে হিরো গ্রুপের কোনো স্পষ্ট ধারণা বা অধিকার ছিল না। এই তথ্যের অসমতা সম্পর্কের মধ্যে ব্যাপক আস্থার সংকট তৈরি করেছিল।
বিচ্ছেদের চুক্তি ও হিরো মোটোকর্পের আত্মপ্রকাশ
পারস্পরিক দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর উভয় সংস্থা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হওয়ার ঘোষণা দেয়। চুক্তির শর্তানুসারে:
* শেয়ার হস্তান্তর: হিরো গ্রুপের মুঞ্জাল পরিবার হিরো হোন্ডায় থাকা হোন্ডার সম্পূর্ণ ২৬% শেয়ার কিনে নেয়।
* প্রযুক্তিগত সহায়তা: হোন্ডা প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা ২০১৪ সাল পর্যন্ত হিরোকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা চালিয়ে যাবে।
* নতুন পরিচয়: ২০১১ সালের আগস্ট মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘হিরো মোটোকর্প’ (Hero MotoCorp)। তারা গ্রহণ করে নতুন লোগো এবং বিখ্যাত স্লোগান “হাম মেঁ হ্যায় হিরো”।
বিচ্ছেদের পরবর্তী অধ্যায়
অনেকে ধারণা করেছিলেন যে জাপানি প্রযুক্তির সমর্থন ছাড়া হিরো হয়তো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন হয়েছে। আলাদা হওয়ার পর হিরো রাজস্থানের জয়পুরে গড়ে তোলে তাদের নিজস্ব অত্যাধুনিক ‘সেন্টার অফ ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি’ (CIT) এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশে সফলভাবে বাইক রপ্তানি শুরু করে। তারা আজও ভারতের বাজারে সর্বোচ্চ টু-হুইলার বিক্রেতা।
অন্যদিকে, হোন্ডাও তাদের স্বাধীন ব্যবসার মাধ্যমে ভারতে অত্যন্ত দ্রুত প্রসার লাভ করেছে এবং বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম টু-হুইলার ব্র্যান্ড।
উপসংহার
হিরো হোন্ডার বিচ্ছেদ কোনো আকস্মিক ব্যর্থতা ছিল না; এটি ছিল দুটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্র্যান্ডের সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হওয়া ব্যবসায়িক লক্ষ্যের স্বাভাবিক পরিণতি। যতদিন যৌথ উদ্যোগটি পারস্পরিক প্রয়োজনে কার্যকর ছিল, ততদিন তা সফল হয়েছে। কিন্তু যখন হিরো স্বাধীন বিশ্বমানের ব্র্যান্ড হতে চাইল এবং হোন্ডা ভারতীয় বাজারে একক আধিপত্য বিস্তার করতে চাইল, তখন বিচ্ছেদই ছিল দুজনের জন্যই সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
Tags
News