দু’বার ব্যর্থতার পর সর্বভারতীয় শীর্ষে — NET JRF-এ বাজিমাত লোপামুদ্রা জানার

Net JRF success story of lopamudra jana


বাংলায় একটি খুব প্রচলিত প্রবাদ আছে, "সাফল্য মানেই শেষ নয়, আর ব্যর্থতা মানেই হেরে যাওয়া নয়; আসল হলো এগিয়ে যাওয়ার সাহস ধরে রাখা।" এই কথাটিকেই অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করে দেখালেন হাওড়ার শ্যামপুরের অদম্য মেধাবী তরুণী লোপামুদ্রা জানা। দু-দুবার ব্যর্থ হওয়ার পরেও দমে না গিয়ে, তৃতীয় প্রচেষ্টায় সর্বভারতীয় স্তরে গবেষণার যোগ্যতামান যাচাইয়ের পরীক্ষা ‘নেট’ (UGC NET)-এ জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপে (JRF) বাংলায় সম্ভাব্য প্রথম স্থান অধিকার করে নজির গড়লেন তিনি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনী প্রমাণ করে দিলেন যে, লক্ষ্য যদি স্থির থাকে এবং ভুল থেকে শেখার মানসিকতা থাকে, তবে আকাশছোঁয়া সাফল্যও হাতের মুঠোয় আসে।

লোপামুদ্রা জানার সাফল্যের ভিত তৈরি হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। হাওড়া জেলার শ্যামপুরের বাসিন্দা লোপামুদ্রার পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা ছিল ছোটবেলা থেকেই। তাঁর মেধার প্রথম বড় পরিচয় পাওয়া যায় স্নাতক স্তরে। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বাংলা বিভাগে স্নাতক হওয়ার সময় তিনি শুধু সফলই হননি, বরং ২০২২ সালে বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক (Gold Medal) জয় করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পা রাখেন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই তিনি স্নাতকোত্তর (MA) সম্পন্ন করেন।

কে এই লোপামুদ্রা জানা ? 

লোপামুদ্রা হলো হাওড়ার শ্যামপুরের কোটরা গ্রামের মেয়ে। রাধাপুর হাইস্কুল থেকে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। তারপর সোজা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক। সেখানেও প্রথম হয়েছিলেন, পেয়েছিলেন স্বর্ণপদক।


ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা: লোপামুদ্রার চড়াই-উতরাই
লোপামুদ্রার এই জয়যাত্রা কিন্তু মসৃণ ছিল না। স্নাতকোত্তর স্তরে পড়ার সময় তিনি দু-বার নেট পরীক্ষায় বসেন। অনেকের ধারণা থাকে যে, যারা স্নাতক স্তরে স্বর্ণপদক পান, তাঁদের জন্য যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা সহজ। কিন্তু লোপামুদ্রার ক্ষেত্রে জেআরএফ (JRF) পাওয়াটা শুরুতে অধরাই থেকে গিয়েছিল। পরপর দুবার ব্যর্থতা যেকোনো ছাত্রছাত্রীর মনেই হতাশা তৈরি করতে পারে। লোপামুদ্রাও হয়তো সাময়িকভাবে থমকে গিয়েছিলেন, কিন্তু থেমে যাননি।
লোপামুদ্রা জানান, “দু’বার সফল না হলেও আমি হার মেনে নিইনি। বরং আমি খতিয়ে দেখেছি আমার কোথায় ভুল হচ্ছিল। কোন বিষয়গুলো আরও গভীর ভাবে পড়া প্রয়োজন ছিল, সেটা বুঝে নিজেকে তৈরি করেছি।” তাঁর মতে, ব্যর্থতা আসলে নিজেকে সংশোধন করার একটি বড় সুযোগ।

লোপামুদ্রার নজিরবিহীন ফলাফল: দুই বারের ব্যর্থতার গ্লানি কাটিয়ে তৃতীয় বারের প্রচেষ্টায় লোপামুদ্রা যা করে দেখিয়েছেন, তা বাংলার ছাত্রছাত্রীদের কাছে এক বিশাল দৃষ্টান্ত। ৩০০ নম্বরের এই কঠিন পরীক্ষায় তিনি ২৩২ নম্বর পেয়েছেন। তাঁর এই প্রাপ্ত নম্বর তাঁকে সারা বাংলায় সম্ভাব্য প্রথম স্থানের (JRF) আসনে বসিয়েছে। বাংলার বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে সর্বভারতীয় স্তরে এই ধরনের ফলাফল অত্যন্ত গর্বের বিষয়। বিশেষ করে নেট পরীক্ষার মতো একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়, যেখানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী অংশ নেন।

তার সাফল্যের মূলমন্ত্র: একাগ্রতা ও ধারাবাহিকতা
লোপামুদ্রার সাফল্যের পেছনে কোনো জাদুমন্ত্র ছিল না, ছিল কঠোর পরিশ্রম এবং বিশেষ কিছু কৌশল। তিনি বিশ্বাস করেন, সাফল্যের চাবিকাঠি হলো ‘ধারাবাহিকতা’। অনেক ছাত্রছাত্রী পরীক্ষার আগে টানা ১০-১২ ঘণ্টা পড়ে এবং তারপর দীর্ঘ বিরতি নেয়। লোপামুদ্রা এই পদ্ধতির বিরোধী। তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে অল্প সময় হলেও পড়েছেন। তাঁর কথায়, “নিয়ম করে প্রতিদিন পড়াটাই সবচেয়ে জরুরি। কখনও পড়াশোনা আর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।”
পড়াশোনার পাশাপাশি লোপামুদ্রা একজন দক্ষ সংগীতশিল্পীও বটে। গানের প্রতি তাঁর এই অনুরাগ তাঁকে মানসিক প্রশান্তি দিয়েছে, যা পরোক্ষভাবে তাঁর পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করেছে।


লোপামুদ্রার এই সাফল্যের পেছনে তাঁর পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর বাড়িতেই রয়েছে পড়াশোনার এক সুস্থ পরিবেশ। মা সঞ্চিতা তরফদার জানা একজন স্কুল শিক্ষিকা এবং নিজেও বাংলার ছাত্রী ছিলেন। এমনকি তাঁর মা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা (PhD) করেছেন। বাবা কমলকান্তি জানা ফাইন আর্টসের সাথে যুক্ত। সৃজনশীলতা এবং পড়াশোনার এই মেলবন্ধন লোপামুদ্রাকে ছোট থেকেই অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর সাফল্যে আজ গর্বিত তাঁর বাবা-মা, শিক্ষক এবং শ্যামপুরের সাধারণ মানুষ।

লোপামুদ্রার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: রবীন্দ্র সাহিত্যে গবেষণা
শুধুমাত্র একটি চাকরি পাওয়াই লোপামুদ্রার লক্ষ্য নয়। তিনি বাংলা সাহিত্যকে গভীরভাবে ভালোবাসেন। বিশেষ করে রবীন্দ্র সাহিত্যের ওপর তাঁর প্রবল অনুরাগ রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো নামী প্রতিষ্ঠান থেকে রবীন্দ্র সাহিত্যের ওপর গবেষণা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা খুব পরিষ্কার— "শুধু চাকরির জন্য পড়ো না, যে বিষয়টিকে ভালোবাসো, সেটি মন দিয়ে পড়ো। দেখবে সাফল্য এবং কাজ সময়ের সাথে সাথেই তোমার কাছে আসবে।"

ইউজিসি নেট (UGC NET) পরীক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ (FAQs)

১. নেট (NET) পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য প্রতিদিন কতক্ষণ পড়া উচিত?
উত্তর: কতক্ষণ পড়ছেন তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি প্রতিদিন পড়ছেন কি না। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তত ৩-৪ ঘণ্টা গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লে ভালো ফল করা সম্ভব।

২. বারবার ব্যর্থ হলে কী করা উচিত?
উত্তর: ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে নিজের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। সিলেবাসের কোন অংশে খামতি আছে তা চিহ্নিত করে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।

৩. বাংলা বিষয় নিয়ে কি সর্বভারতীয় স্তরে সাফল্য পাওয়া সম্ভব?
উত্তর: অবশ্যই। লোপামুদ্রা জানা তার জীবন্ত প্রমাণ। সঠিক কৌশল এবং আধুনিক প্রশ্নপত্রের ধরন বুঝে পড়াশোনা করলে বাংলা বিষয়েও  প্রথম হওয়া সম্ভব।

৪. ইউজিসি নেট-এ জেআরএফ (JRF) পাওয়ার সুবিধা কী?
উত্তর: জেআরএফ পেলে গবেষক হিসেবে আর্থিক বৃত্তি পাওয়া যায় এবং ভারতের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি (PhD) করার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার পাওয়া যায়।

লোপামুদ্রা জানার এই জয় কেবল একটি পরীক্ষার ফল নয়, এটি একটি অসম্ভবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প। তাঁর এই যাত্রা আমাদের শেখায় যে, হার না মানার মানসিকতা থাকলে স্বপ্ন সত্যি করা সম্ভব। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কৃতী ছাত্রী আজ বাংলার লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থী এবং ছাত্রছাত্রীর কাছে অনুপ্রেরণা। মেধা, একাগ্রতা আর ধৈর্যের মেলবন্ধনে লোপামুদ্রা যে নজির স্থাপন করেছেন, তা আগামী দিনে বহু গবেষককে পথ দেখাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন